রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন মির্জা ফখরুল, কে হচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে এখনো বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও নতুন সমীকরণ
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার আলোচনার পাশাপাশি এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সাবেক নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ভোটে অংশ নেবেন। প্রতিটি সংসদ সদস্য একটি করে ভোট দিতে পারবেন।
কে হচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব
সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা শুধু দেশের সাংবিধানিক পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে না, বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন—ফখরুলের পর বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে?
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে একই সঙ্গে বিএনপির রাজনীতিতে তৈরি হবে বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সমীকরণ। প্রায় ১৬ বছর ধরে দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা ফখরুল রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলে তাঁর জায়গায় কে বসবেন—এখন সেটিই বিএনপির ভেতরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন।
দলীয় সূত্র ও সাম্প্রতিক আলোচনায় মহাসচিব পদে সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে তিনটি নাম—সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। তবে এ দৌড়ে রিজভীর নামই তুলনামূলকভাবে বেশি জোরালো বলে দলীয় পর্যায়ের আলোচনায় উঠে এসেছে।
মির্জা ফখরুল অধ্যায় শেষ হলে কি রিজভীর শুরু?
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় রুহুল কবির রিজভীকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছেন দলের অনেক নেতা। বিশেষ করে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে জাতীয় কাউন্সিলের আগে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন।
রিজভীর পক্ষে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে দলের তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। দীর্ঘ সময় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর কারণে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়েও তিনি সামনে থেকে ভূমিকা পালন করেছেন।
দলের দুঃসময়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে রিজভী বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত মুখ। ফলে মহাসচিব পদে তাঁকে দায়িত্ব দিলে দলীয় কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে—এমন একটি ধারণাও রয়েছে দলের ভেতরে।
সালাহউদ্দিনও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী
তবে রুহুল কবির রিজভীর সামনে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদের নামও জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দলের কঠিন সময়ে সাংগঠনিক ভূমিকা, রাজনৈতিক কৌশল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার কারণে তাঁর নাম মহাসচিব পদে বিবেচনায় রয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এমন ধারণাও রয়েছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নেতাদের পরিবর্তে দলের সাংগঠনিক কাজে পূর্ণ সময় দিতে পারবেন—এমন কাউকে মহাসচিব করা হতে পারে। কারণ দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় কর্মকাণ্ডও দেখভাল করছেন। ফলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে মহাসচিবের ওপর দল পরিচালনার বড় দায়িত্ব থাকবে।
আলোচনায় হাবিব উন নবী খান সোহেল
মহাসচিব পদের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। বিগত সরকারের সময় মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে তার ভূমিকার কথাও দলীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সোহেলকে তুলনামূলক তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংগঠনে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার সক্রিয়তার কারণে মহাসচিব পদে তার নামও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাবেক ডাকসু ভিপি আমান উল্লাহ আমান এবং যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের নামও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।
কাউন্সিলের আগেই আসতে পারে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী মহাসচিব নির্বাচন নাও হতে পারে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে দলটি একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিল বা কাউন্সিলকে ঘিরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে রিজভীর সম্ভাবনা আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন দলের কেউ কেউ। কারণ বিএনপির অতীত রাজনৈতিক রীতিতেও জ্যেষ্ঠ বা প্রথম সারির যুগ্ম মহাসচিবকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার নজির রয়েছে।
চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠেয় এই কাউন্সিলেই দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফখরুলের দীর্ঘ নেতৃত্বের অবসান?
মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। এরপর ২০১৬ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের দীর্ঘ সময়েও তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি ছয়বার কারাগারে যান। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের নেতৃত্ব ধরে রাখায় বিএনপির ভেতরে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
এর আগে মির্জা ফখরুল নিজেই বয়স ও দীর্ঘ রাজনৈতিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।
এদিকে, দলীয় পর্যায়ের বর্তমান আলোচনায় রুহুল কবির রিজভী এগিয়ে থাকলেও সালাহউদ্দিন আহমদ ও হাবিব উন নবী খান সোহেলও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবের সমীকরণ। আর সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করতে পারে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি আগামী দিনের বিএনপি সংগঠন কীভাবে চলবে।

