বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত থাকুক: প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গাদের চিরস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি নয়, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন চায় বাংলাদেশ। এ জন্য মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্যোগে গাম্বিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও তার সমাধান খোঁজার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে; প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে যাওয়ার সময় এসেছে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটানোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

প্রত্যাবাসনে বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা

তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তার আওতায় রাখার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের উদারভাবে আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।

জবাবদিহি নিশ্চিতের আহ্বান

চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিকে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাকে অব্যাহত সহযোগিতা দেওয়ার আহ্বান জানান।

গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় সহযোগিতা

পঞ্চম প্রস্তাবে মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে মানবপাচার, মাদকপাচার ও অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ উল্লেখযোগ্য।

‘রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত থাকুক, বাংলাদেশ তা চায় না’

পাঁচ প্রস্তাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। আমরা চাই, তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

‘সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে’

রোহিঙ্গা সংকটের পটভূমি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের বড় দফার আগমন প্রত্যক্ষ করেছে।

তার ভাষ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সংকট আরও তীব্র হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব বহন করে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখনো ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয়ে রয়েছে। মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে নতুন করে মানুষ পালিয়ে আসছে। শিবিরগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্ম যুক্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।

শিবিরে মানবিক সহায়তা, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রায় ৬ হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার প্রস্তুতির অংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য শরণার্থী শিবিরগুলো কোনো আদর্শ স্থান নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাড়ছে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির চাপ

দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির ব্যয় শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, কক্সবাজারের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও বাড়ছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এখন বিপুল। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসনসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।

কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কমছে মানবিক সহায়তা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে।

২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন তাদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন।

মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের ওপর বহন করার প্রত্যাশাও করা যায় না।

রাখাইনে এখনো নিরাপদ পরিবেশ নেই

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও গুরুতর লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি।

‘রোহিঙ্গাদের ভাগ্য ন্যায়বিচার ও আশার গল্প হোক’

বক্তব্যের শেষ দিকে বিশ্বফোরামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে। বরং তা হয়ে উঠুক ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই গল্পের সূচনা হোক এখনই।

বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমান, জাতিসংঘ মহাসচিবের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং গাম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বি এস জালো বক্তব্য দেন।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম ছালিহ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *