ঢাকা মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে আলোচনায় ডজনখানেক নেতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসে নজর দিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে বলে দলীয় একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই দুই ইউনিটে নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে বলে গুঞ্জন চলছে।

দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে রাজপথের সক্রিয়তা, দীর্ঘদিনের ত্যাগ, তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তি। একই সঙ্গে সরকার বা সংসদীয় দায়িত্বে থাকা নেতাদের মহানগর বিএনপির শীর্ষ পদে না রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে আলোচনা আছে।

বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় কাজে ব্যস্ততার কারণে মহানগরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আগের মতো সময় দেওয়া কঠিন হওয়ায় নেতৃত্বে পরিবর্তনের আলোচনা জোরালো হয়েছে।

উত্তরে আলোচনার কেন্দ্রে যারা

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, মামুন হাসান, আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, মোস্তফা জামান, এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক, জগলুল পাভেল পাশা, কফিল উদ্দিন আহমেদ ও এ জি এম শামসুল হকের নাম উঠে এসেছে।

আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার

মহানগর উত্তরের দীর্ঘদিনের সক্রিয় নেতা আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার—যিনি ‘কাউন্সিলর আনারুজ্জামান’ নামে পরিচিত—সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন। দীর্ঘদিন তিনি মহানগর রাজনীতিতে সক্রিয় এবং হামলা-মামলা সহ্য করে রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন। দল দায়িত্ব দিলে তিনি তা পালনে প্রস্তুত বলে জানা গেছে।

মামুন হাসান

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে উত্তর মহানগরের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম সম্ভাব্য মুখ হিসেবে আলোচনা করা হচ্ছে। তিনি যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। দলীয় সূত্রের দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তাকে কারাবরণও করতে হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর মহানগর নেতৃত্বে তার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এস এম জাহাঙ্গীর

ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। নগর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১৮ আসনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে মহানগর উত্তরের নেতৃত্বের আলোচনায় তাঁর নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।

শফিকুল ইসলাম মিল্টন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নামও মহানগর উত্তর বিএনপির শীর্ষ পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন

সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনও শীর্ষ নেতৃত্বের দৌড়ে আলোচিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এফ রহমান হলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় আন্দোলনে সক্রিয় থাকার দাবি করেছেন। বর্তমানে মহানগর উত্তরের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তার সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে।

মোস্তফা জামান

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব মোস্তফা জামানের নাম সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পদে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। মহানগর উত্তরের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আমিনুল হককে আহ্বায়ক এবং মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

জগলুল পাভেল পাশা

জগলুল পাভেল পাশা বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সাবেক সদস্য সচিব। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনায় তাঁর নাম উঠে এসেছে।

এ বি এম আব্দুর রাজ্জাক

দীর্ঘদিনের সংগঠক হিসেবে এ বি এম আব্দুর রাজ্জাকের নামও শীর্ষ পদে আলোচনায় আছে। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত এবং ২০১৮ সাল থেকে মহানগরের বিভিন্ন কমিটিতে দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলনের সময়ে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের মুখোমুখি হওয়ার কথাও তার রাজনৈতিক প্রোফাইলে উঠে এসেছে।

কফিল উদ্দিন আহমেদ ও এ জি এম শামসুল হক

মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক কফিল উদ্দিন আহমেদের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বে রয়েছে। পাশাপাশি এ জি এম শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের একজন।

দক্ষিণে আলোচনার কেন্দ্রে যারা

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকাতেও একাধিক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতার নাম রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, বদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, মহানগর দক্ষিণের সাবেক সদস্য সচিব ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, আ ন ম সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন ও সাইদুর রহমান মিন্টু রয়েছেন।

হামিদুর রহমান হামিদ

ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদের নাম মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে মহানগর দক্ষিণের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থানও আলোচনায় রয়েছে।

আব্দুল মোনায়েম মুন্না

যুবদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার নামও মহানগর দক্ষিণ বিএনপির শীর্ষ পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকার কারণে দলটির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কাজী আবুল বাশার

দক্ষিণ বিএনপির সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি কাজী আবুল বাশার। তিনি দীর্ঘদিন মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় ১৮ বছর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ছিলেন। রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি পুরান ঢাকায় তার বড় কর্মীভিত্তি রয়েছে। ফলে তাকে মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ নেতৃত্বে দেখতে চান তার অনুসারীদের একটি অংশ।

তানভীর আহমেদ রবিন

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনও শীর্ষ পদে অন্যতম আলোচিত মুখ। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। দলের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন কমিটিতেও তার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

আ ন ম সাইফুল ইসলাম

মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলামের নামও শীর্ষ পদে আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান কমিটিতে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রাখা হচ্ছে।

মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন

ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমানে মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নামও উঠে এসেছে। তুলনামূলক তরুণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে নতুন কমিটিতে তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

সাইদুর রহমান মিন্টু

মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টুও সম্ভাব্য নেতৃত্বে আলোচিত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা। দলের কঠিন সময়ে দপ্তরের দায়িত্ব সামলানো এবং তৃণমূল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে তার নাম সামনে এসেছে।

ঢাকা মহানগরের নতুন কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, সংগঠনের গতিশীলতার স্বার্থে পরিবর্তন আসতেই পারে, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে ঢাকা মহানগরে এখনই কমিটি হবে কিনা অফিসিয়ালি এই ধরনের কোনও তথ্য আমার কাছে নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *