মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত, বাদ পড়তে পারেন ৫ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ৪৭ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর প্রথম ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনার মূল্যায়ন শেষে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে অন্তত তিনজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
জানা গেছে, সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, ছয় মাস পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মূল্যায়ন করা হবে। সেই মূল্যায়ন কার্যক্রম বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নামও আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ার পাশাপাশি তার দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এদিকে, আরেকজন প্রভাবশালী পূর্ণ মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের কারণে তাকে পরিবর্তনের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও, একটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ভিন্ন মত প্রকাশ করেছে।
এছাড়া, আরেকজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাকে বাদ দেওয়ার আলোচনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, সম্ভাব্য রদবদলে নতুন কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিনের নাম আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও সূত্রের দাবি।
এ ছাড়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান এবং সেলিমা রহমানসহ বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় কয়েকটি নতুন মুখ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া জোটের শরিক দল থেকেও নতুন সদস্য যুক্ত হতে পারেন।
মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় নতুন মুখ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।
সংসদ সদস্যদের মধ্যে শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ (সদর-নলডাঙ্গা) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও ঢাকা-২ (কেরানীগঞ্জ ও সাভার আংশিক) মো. আমানুল্লাহ আমান, গাজীপুর-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এ.কে.এম.ফজলুল হক মিলন।
অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, প্রখ্যাত শিক্ষক নেতা ও কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রথম যুগ্ম-আহ্বায়ক পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য বি এম মোশাররফ হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও খুলনা-৪ (রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজগঞ্জ-৫ (চৌহালী ও বেলকুচি) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান আলিম ও ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ও ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক।
এছাড়া, সরকারের শরিক ও সমমনা দলগুলোর মধ্য থেকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক আলোচনায় রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় পর মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মূল্যায়ন একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আর মন্ত্রিসভার আকার কতটা পরিবর্তন হবে এবং শেষ পর্যন্ত কারা দায়িত্ব পাবেন বা বাদ পড়বেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদে রয়েছেন ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। ২৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে ছয়জন দুটি করে, দুজন তিনটি করে এবং বাকিরা একটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে চারজন দুটি করে এবং বাকিরা একটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
এ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর বর্তমানে ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যার মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার। তারা ১৬টি মন্ত্রণালয় তদারকি করছেন এবং প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার তিনজন বিশেষ সহকারী রয়েছেন।

