সংসদ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা, অগ্রাধিকারে তিন গুরুত্বপূর্ণ বিল

প্রায় দেড় মাসের বিরতি শেষে আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৩টায় বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। নতুন সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই বাকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন এবং পাঁচটি বেসরকারি সদস্যের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটবে সংসদে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের আইন প্রণয়ন শাখা-১ থেকে প্রকাশিত প্রথম দিনের কার্যসূচি বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা গেছে। কার্যসূচি অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোকপ্রস্তাবের পর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এরপর জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশ নিষ্পত্তি, বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব এবং সংসদীয় কমিটি গঠনের কার্যক্রম রয়েছে।

প্রথম দিনেই কমিটি গঠনের উদ্যোগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনে ইতোমধ্যে মোট ১৯টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পাশাপাশি কার্য উপদেষ্টা কমিটি, সংসদ কমিটি, বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, বেসরকারি সদস্যদের বিল এবং বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব সম্পর্কিত কমিটিও রয়েছে।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, নতুন সংসদকে তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি করে স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হয়। ফলে তৃতীয় অধিবেশনের শুরুতেই কমিটি গঠনকে কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, এবারের অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। বিরোধী দলের কাছ থেকে সদস্যদের তালিকা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিটিগুলো চূড়ান্ত করা হবে। অধিবেশনটি ৫, ৭ বা ১০ দিনের মতো সংক্ষিপ্ত হতে পারে; তবে প্রয়োজন হলে সময় বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

তিন গুরুত্বপূর্ণ বিলের যাত্রা শুরু

তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের কথা রয়েছে। এগুলো হলো—ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬।

১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল আনা হচ্ছে। অন্যদিকে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল উত্থাপন করা হবে।

সবচেয়ে আলোচিত বিলগুলোর একটি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬। গুম প্রতিরোধ, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষণ এবং প্রতিকারের পাশাপাশি মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে বিলটি আনা হচ্ছে।

কার্যসূচি অনুযায়ী, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করা হবে। আর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলটি যাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে।

স্থানীয় উন্নয়ন ঘিরে পাঁচ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব

প্রথম দিনের কার্যসূচিতে রয়েছে পাঁচটি বেসরকারি সদস্যের সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব। এর মধ্যে টাঙ্গাইল-৭ আসনের আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী মির্জাপুর উপজেলায় একটি কৃষি কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব তুলবেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের মো. আবদুল মান্নান নবীনগরে কৃষি কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব দেবেন। চট্টগ্রাম-১২ আসনের মোহাম্মদ এনামুল হক জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পটিয়া আদালত ভবন দ্রুত নির্মাণের দাবি তুলবেন।

এ ছাড়া নরসিংদী-৫ আসনের মো. আশরাফ উদ্দিন রায়পুরা নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশন থেকে আমিরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্টেশন হয়ে শ্রীরামপুর রেলগেট পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণ করে শ্রীনিধী ও দৌলতকান্দি হয়ে ভৈরব রেলস্টেশন পর্যন্ত সড়ক বর্ধিত করার প্রস্তাব দেবেন।

সাতক্ষীরা-২ আসনের মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক সাতক্ষীরা জেলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।

বাজেট অধিবেশনের পর তৃতীয় অধিবেশন

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়ে ৩০ এপ্রিল শেষ হয়। এরপর ৭ জুন শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন, যা ছিল সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশনও। ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন এবং ৩০ জুন বাজেট পাসের পর অধিবেশন ১৫ জুলাই পর্যন্ত চলে।

দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস পর আজ শুরু হচ্ছে তৃতীয় অধিবেশন। কমিটি গঠন, মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুতে আলোচনার সম্ভাবনায় এবারের অধিবেশনটি নতুন সংসদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

সংসদ ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা

অধিবেশনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংসদ এলাকা এবং এর চারপাশে সভা-সমাবেশ, মিছিল ও সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অধিবেশন চলাকালে নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *