সালমান শাহর মৃত্যু রহস্যে নতুন মোড়, দৃশ্যপটে শাবনুর-সামিরা

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মৃত্যুর একটি সালমান শাহর মৃত্যু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ২৫ বছর বয়সে প্রয়াত হন জনপ্রিয় এই নায়ক। শুরুতে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও প্রায় তিন দশক ধরে পরিবারের পক্ষ থেকে চলে আসছে হত্যার অভিযোগ। নতুন হত্যা মামলা, আসামি গ্রেপ্তার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই পুরোনো রহস্যই আবার সামনে এসেছে।

চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন—চলচ্চিত্রজগতের সালমান শাহ। মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দর্শকের অন্যতম প্রিয় নায়ক। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল, প্রায় ৩০ বছর পরও তার পুরোপুরি অবসান হয়নি।

আত্মহত্যার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, পরিবারের শুরু থেকেই আপত্তি

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটন প্লাজার বাসা থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি; তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে মা নীলা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়ে আসছেন। এই অবস্থার মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে একাধিক তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পরিবারের হত্যার অভিযোগ থামেনি।

প্রায় ২৯ বছর পর হত্যা মামলা

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় মামলাটি করেন।

মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তাঁর মা লতিফা হক, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।

হঠাৎ বিমানবন্দরে ডন, তারপর কারাগারে

সালমান শাহ হত্যা মামলার ৪ নম্বর আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে ২০২৬ সালের ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটক করে। মামলার কারণে তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে জানানো হয়েছে। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পরে আদালতে হাজির করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে তদন্ত সংস্থা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জানান, ডন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে।

১২ লাখ টাকার চুক্তির দাবি

আদালতের শুনানিতে রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদের একটি পুরোনো স্বীকারোক্তির কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার ঘটনায় করা মামলায় রেজভির দেওয়া জবানবন্দিতে সালমান শাহকে হত্যার একটি পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। সেখানে ডন, ফারুক ও রেজভির মধ্যে ১২ লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগের কথাও বলা হয়।

শুনানিতে আরও দাবি করা হয়, সালমান শাহকে প্রথমে অচেতন করে পরে আত্মহত্যার দৃশ্য তৈরি করতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগ; আদালতে এখনো প্রমাণিত সত্য নয়।

মামলার সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র রেজভী 

সালমান শাহর মৃত্যু রহস্যে রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদের নাম বহু বছর ধরেই আলোচিত। শাবনূরের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে সালমানের ছোট ভাই শাহরান চৌধুরী বিল্টুকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর রেজভি আদালতে জবানবন্দি দেন এবং সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন।

শাবনূরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই জবানবন্দিতে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রেজভির বক্তব্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০১৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন এবং তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারেও তিনি আত্মহত্যার কথা বলেছেন।

এ কারণেই শাবনূর প্রশ্ন তুলেছেন—একই ব্যক্তি একই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে তাঁর কোন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য?

নতুন অভিযোগে এবার সরব শাবনূর

সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই শাবনূরের নাম নানা আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজভী আহমেদ তাঁর বিরুদ্ধে সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ তোলেন এবং তাঁর মৃত্যুর জন্য শাবনূরকে দায়ী করেন।

এর পর ৮ আগস্ট দীর্ঘ এক ফেসবুক বার্তায় মুখ খোলেন শাবনূর। তিনি রিজভীর বক্তব্যকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও মানহানিকর বলে দাবি করেন।

শাবনূর আরও দাবি করেন, রিজভী কখনো বলেছেন তিনি তাঁকে ভালোবাসতেন ও বিয়ে করতে চেয়েছিলেন; আবার অন্য সাক্ষাৎকারে তাঁকে সাবেক প্রেমিকা এবং ২০১৬ সালে বিয়ে ও ২০১৮ সালে বিচ্ছেদের দাবি করেছেন। শাবনূর এসব দাবিরও তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, ওই সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যে যাননি এবং রিজভীর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না।

সালমান-শাবনূর সম্পর্ক: প্রেম নাকি ভাই-বোন?

সালমান শাহ ও শাবনূর ছিলেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি। ‘তুমি আমার’ দিয়ে শুরু হয়ে তাঁদের জুটি একে একে ‘সুজন সখী’, ‘বিচার হবে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’সহ ১৪টি সিনেমায় দর্শককে মুগ্ধ করে।

সালমান শাহর চার বছরের অভিনয়জীবনে ২৭টি সিনেমার মধ্যে ১৪টিতে তাঁর নায়িকা ছিলেন শাবনূর। পর্দার জনপ্রিয় রসায়ন থেকেই তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে শাবনূর বরাবরই প্রেমের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সালমান তাঁকে বোনের মতো দেখতেন এবং তিনিও সালমানকে ভাইয়ের মতোই সম্মান করতেন।

এবার একই কথা বলেছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীও। তাঁর দাবি, শাবনূরের সঙ্গে সালমানের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। বরং নিজের কোনো বোন না থাকায় সালমান শাবনূরকে বোনের মতো স্নেহ করতেন এবং তাঁকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। তাহলে সালমান শাহর মৃত্যুর রাতে আসলে কী ঘটেছিল? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন পুরো তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।

মামলার শেষ পরিণতি কি?

একদিকে, রয়েছে ময়নাতদন্ত ও অতীতের তদন্তে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করার ইতিহাস। অন্যদিকে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের হত্যার অভিযোগ এবং নতুন হত্যা মামলায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ।

রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার দিনের কিছু পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। আবার তদন্ত আবেদনে বলা হয়েছে, মামলার আসামিদের যোগসাজশে হত্যার অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্ত এখনো চলমান। অর্থাৎ, তিন দশক ধরে যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে, তার চূড়ান্ত জবাব এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

ডন গ্রেপ্তারের পর কেন বাড়ছে প্রত্যাশা?

ডনের গ্রেপ্তারকে মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ তিনি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যায় যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদালতের কাছে তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়, যাতে তদন্তে বিঘ্ন না ঘটে এবং তিনি পুনরায় পলাতক হতে না পারেন।

৩০ আগস্টের দিকে তাকিয়ে সবাই

সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩০ আগস্ট তারিখ ধার্য রয়েছে। ফলে ডন গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন কোনো তথ্য, সাক্ষ্য বা প্রমাণ সামনে আসে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

প্রায় তিন দশক ধরে সালমান শাহর মৃত্যু ঘিরে যে বিতর্ক—আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—তা এখন আবার নতুন করে আলোচনায়। ডনের গ্রেপ্তার, রিজভী আহমেদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং শাবনূরের প্রকাশ্য প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে পুরোনো মামলাটি যেন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

তবে শেষ পর্যন্ত সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত সত্য কী—আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? উত্তর মিলবে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায়। আপাতত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তিন দশক পরও এই রহস্যের পর্দা পুরোপুরি ওঠেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *