এবার বড় চমক রেখে ছাত্রদলের কমিটি, শেষ মুহূর্তে অলোচনায় যারা

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘিরে শেষ মুহূর্তের তৎপরতা বেড়েছে। বর্তমান রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিভিন্ন ইউনিটের সক্রিয় নেতাদের নাম উঠে এসেছে।

সভাপতি পদে একাধিক হেভিওয়েট

নতুন কমিটির সভাপতি পদে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসিত, সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সহসভাপতি ইজ্জাজুল কবির রুয়েল, সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরসেদ আলম সোহেল, প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস। এ ছাড়া, সাফি ইসলাম, আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ও মো. তরিকুল ইসলাম তারিকের নামও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক পদে দীর্ঘ তালিকা

সাধারণ সম্পাদক পদেও রয়েছে একাধিক সম্ভাব্য নাম। আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুর রহিম রনি, তারেক হাসান মামুন, মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, মাহমুদ ইসলাম কাজল, নাছির উদ্দিন শাওন, দ্বীন ইসলাম খান ও নাহিদুজ্জামান শিপন। ২০১২-১৩ সেশন থেকে তৌহিদুল ইসলামের নামও আলোচনায় রয়েছে।

অন্য একটি সূত্রে সাধারণ সম্পাদক পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামিম আকতার শুভ, নাকিবুল ইসলাম চৌধুরী, রাজু আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান ও মাসুম বিল্লাহর নামও উঠে এসেছে।

‘সুপার টু’ নাকি ‘সুপার ফাইভ’

নতুন কমিটির কাঠামো নিয়েও তৈরি হয়েছে আলাদা আলোচনা। শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়ে ‘সুপার টু’ ঘোষণা হবে, নাকি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে ‘সুপার ফাইভ’—এখন সেটিও বড় প্রশ্ন। এর আগে সাত সদস্যের ‘সুপার সেভেন’ দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রাথমিক কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে সেটি ২৬১ সদস্যে সম্প্রসারিত হয়। ফলে এবার প্রাথমিকভাবে কতজনকে নিয়ে শীর্ষ কাঠামো ঘোষণা করা হয়, সেদিকেও নজর রয়েছে।

ব্যাচের হিসাবেও বদল আসতে পারে

নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে শিক্ষাবর্ষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমান সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ২০০৬-০৭ সেশনের শিক্ষার্থী হওয়ায় তাঁর ব্যাচ এবং এর আগের কয়েকটি ব্যাচ এবার শীর্ষ নেতৃত্বের দৌড় থেকে বাদ পড়তে পারে। একই সঙ্গে খুব জুনিয়রদেরও এখনই শীর্ষ পদে আনার সম্ভাবনা কম।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাছাইয়ের সম্ভাবনা বেশি। তবে এই বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

আন্দোলনে ‘পরীক্ষিত’ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার

নতুন কমিটি গঠনে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে একাধিক সূত্রে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি এখন সংগঠনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় শেষ মুহূর্তের সমীকরণে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাচ, আন্দোলনে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত নেতৃত্ব নির্ধারণের চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে সম্ভাব্য নামের দীর্ঘ তালিকা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই নিশ্চিত প্রার্থী বা সম্ভাব্য পদধারী হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত কারা শীর্ষ নেতৃত্বে আসছেন, সেটিই এখন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।

আলোচনায় আবু আফসান ও কাজী জিয়াউদ্দিন বাসিত

সম্ভাব্য সভাপতি হিসেবে আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়ার নাম বিশেষভাবে আলোচিত। আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির  সহ-সভাপতি কাজী জিয়াউদ্দিন বাসিত দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকায় বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন।

ইয়াহইয়া ২০২২ সালের ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলায় গুরুতর আহত হন। ওই ঘটনায় তাঁর মাথায় ১৭টি সেলাই লাগে এবং পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায় বলে সূত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে গাবতলী থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবরণও করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে ছাত্রদলের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসেত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে হামলা-মামলা ও একাধিকবার কারাবরণের শিকার হয়েও রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে পিছু হটেননি। দলীয় যেকোনো কর্মসূচিতে তিনি সবসময় সক্রিয় থেকেছেন; বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামনের সারিতেই দেখা গেছে তাকে। প্রতিকূলতার মধ্যেও ধারাবাহিকভাবে সংগঠনের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

আমান-জিসান-রুয়েলও শক্ত অবস্থানে

সভাপতি পদের আলোচনায় থাকা আমান উল্লাহ আমান বর্তমানে সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে দুই মাস কারাগারে ছিলেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি ও সংগঠনকে সুশৃঙ্খল করার কাজে যুক্ত থাকার তথ্যও এসেছে।

মমিনুল ইসলাম জিসান বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্র এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ আমলে একাধিকবার মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের শিকার হওয়ার পাশাপাশি ২০২৩ সালে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে ইজ্জাজুল কবির রুয়েল বর্তমানে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দায়িত্বেও ছিলেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার তথ্য এসেছে।

নিয়মিত শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিয়েও ভাবনা

নতুন কমিটি শুধু পুরোনো পরীক্ষিত নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিয়মিত শিক্ষার্থী ও তুলনামূলক তরুণদেরও গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হবে—এ নিয়েও আলোচনা চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো, সংগঠনের ভাবমূর্তি ধরে রাখা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বিতর্কিতদের নিয়ে সতর্ক হাইকমান্ড

নতুন কমিটিতে বিতর্কিত বা অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের কথাও এসেছে কয়েকটি প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য নেতাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভূমিকার পাশাপাশি অতীত কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অভিযোগও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

কিছু পদপ্রত্যাশীর বিরুদ্ধে অতীতে চাঁদাবাজি, অপহরণ, মারধর ও অস্ত্র ব্যবসার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকার কথাও একটি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ওই উপাদানে নেই। ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে যাচাইসাপেক্ষ তথ্য হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে জানিয়ে ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির  জানিয়েছেন, কমিটি কখন হবে—এ সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যানের সাংগঠনিক এখতিয়ারের বিষয়। নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *