বরখাস্তের মুখে জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলাম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিও এবং দ্বিতীয় বিয়েকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে দলটির ভেতরে তীব্র আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা শেষে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের এক তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রথমদিকে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে ভিডিওটিকে এআই (ডিপফেক) প্রযুক্তিতে তৈরি বলে দাবি করা হলেও পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই জানান, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। তার দাবি, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।
তবে বিয়ের কাবিননামা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। ওই তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বয়সের পার্থক্য প্রায় ৫৭ বছর। এছাড়া কাবিননামায় নিবন্ধনকারী কাজী জানিয়েছেন, বিয়ে কোথায় হয়েছে তা তিনি জানেন না, তবে ঢাকায় বিয়ে হয়েছে বলে ফোনে জানানো হলে পরে নিবন্ধনের কাগজ প্রস্তুত করা হয়। এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে মরিয়মের বায়োডাটায় বিয়ের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্যও সামনে এসেছে।
এ ঘটনার পর আরও একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যেখানে একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলামকে কয়েকজনের মুখোমুখি হতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ফেইসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১৩ জুলাই, ২০২৬ ইং তারিখে আমার প্রথমা ও দ্বিতীয় স্ত্রী, যথাক্রমে মোছা. মাকছুদা বেগম ও মোছা. মরিয়াম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক অফিসে যাই। সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি। আমরা উক্ত অফিসে অবস্থানকালে যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে এক লক্ষ টাকা আদায় করে।
তিনি আরও লিখেছেন, আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। আমি এসময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলাম আরও লিখেছেন, পরবর্তীতে, হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রকৃতপক্ষে, ১৭ জুন, ২০২৬ তারিখে পারিবারিকভাবে এবং আমার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে আমার দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়াম বেগমের সঙ্গে তার পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে আমাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। ফলে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো সত্যতা নেই।
গাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, যারা আমাদের সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা যাচাই-বাছাই শেষে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামায়াত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। জামায়াতের পক্ষ থেকে তাকে বরখাস্ত করার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও একটি সূত্র জানিয়েছে গাজী নজরুল ইসলাম বরখাস্তের মুখে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, আইনগত দিক থেকে, কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তার সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। এ ক্ষেত্রে সংবিধান ও সংসদীয় বিধি অনুযায়ী পৃথক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে যদি কোনো দল কাউকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ দল থেকে বরখাস্ত করে এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে তার এমপি পদ রহিত করার জন্য আবেদন করে তাহলে এমপি পদ বাতিল হওয়ার রেওয়াজ আছে। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য লতিফ সিদ্দিকির ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটেছিল। আর কোনো দল যদি শুধু সাংগঠিক পদ বাতিল করে এবং স্পিকারের কাছে এমপি পদ বাতিলের আবেদন না করে তাহলে এমপি পদ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নবম জাতীয় সংসদের জাতীয় পার্টির এমপি সাতক্ষীরা ৪ আসনের এইচএম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোর কারণে তার সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল।

